বুধবার, ০৮ Jul ২০২৬, ০৭:২৯ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : একজনের দোকান আরেকজন বিক্রি করেন। একজনের জমি আরেকজন দলিল করে দেন, আর এবার জানা গেল কে একজন হরিদাশ (আসল নাম নয় এটি) বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বিক্রি করতে যাচ্ছেন। নজিরবিহীন এ ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। ‘লিভিংস্টোন বাংলাদেশ’ নামে এ বিদ্যালয় বিক্রি করতে যাচ্ছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক জনৈক বিমল রায়। বিদ্যালয়টির ব্যবস্থপনা কমিটির সভাপতি সেজে বিমল রায় যোগসাজস করে ইতিমধ্যে বিক্রির বায়নানামা রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন জনৈক কামরুল হুদা বাদশার নামে।
আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিদ্যালয়টি বিক্রি ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে। আর এমন অনৈতিক ঘটনা ঘটলে আগামীতে বিদেশী দাতা সংস্থা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা কোনও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে দ্বিধা করবেন বলে মনে করেন এলাকার লোকজন।
এদিকে, বিদ্যালয়টির সম্পত্তি, স্থাপনা ও অবকাঠামো রক্ষার জন্য মন্মথপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড সদস্য মো.মাহাবুবার রহমান পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত ১৯ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
জানা গেছে, পার্বতীপুর শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দুরে পার্বতীপুর-দিনাজপুর সড়কের দক্ষিণ পাশের লাগোয়া ২নং মন্মথপুর ইউনিয়নের রাজাবাসর মৌজা। এই মৌজায় সিএস খতিয়ান নং ৩২, এসএ খতিয়ান নং ৪৩, খারিজ খতিয়ান নং ১৭৩৭, ডিপি খতিয়ান নং ২০৮, হালদাগ নং ২৯০৩ পরিমাণ ৪৫ শতক জমির ওপর ’লিভিং স্টোন বাংলাদেশ’ স্কুলটি অবস্থিত। বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে ২০১১ সালে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে লিভিং স্টোন স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মারিয়াম সরেন এর নামে জমি ক্রয় করে অত্যাধুনিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয়। সেসময় বিমল রায় লিভিংস্টোন বাংলাদেশ স্কুলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, পরিচালক বিমল রায় স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মতামতের গুরুত্ব না দিয়ে আপন খেয়াল খুশি মত স্বুল পরিচালনা ও অর্থ ব্যয় করতে থাকেন। এতে একসময় বিদেশী দাতা সংস্থা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা অর্থ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এ সুযোগটি কাজে লাগায় বিমল রায়। তিনি কারো সাথে কোন পরামর্শ না করে গত বছর নভেম্বরে স্কুলটি বন্ধ ঘোষনা করেন। এই স্বেচ্ছাচারীতা সংশ্লিষ্টদের হতবাক করে দেয়।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হতো এ বিদ্যালয়টিতে। হঠাৎ করে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর শিক্ষক-শিক্ষার্থী অভিভাবক সবাই বিপাকে পড়ে যান।
তৎকালীন পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) আবু তাহের মোঃ সামসুজ্জামান গত ১১ জুন লিভিংস্টোন স্কুল বাংলাদেশের পক্ষে সভাপতি বিমল রায়ের নামে স্কুলের জমি খারিজ (নামজারি) করে দেয়। তৎকালীন পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) বর্তমানে পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কর্মরত আবু তাহের মোঃ সামসুজ্জামান দাবি করেন- তিনি প্রতিষ্ঠানের নামে খারিজ দিয়েছেন, কোনও ব্যক্তির নামে খারিজ দেননি। এখানে সভাপতি কে সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়।
এরপর গত ২৯ জুলাই জনৈক কামরুল হুদা বাদশার নিকট স্কুলটির স্থাপনা, অবকাঠামোসহ ৪৫ শতক জমি বিক্রি করার জন্য বায়নানামা রেজিস্ট্রি করে দেয়। স্কুলটির বিক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে ৭০ লাখ টাকা।
লিভিংস্টোন বাংলাদেশ স্কুলের পাশেই বিদেশি মিশনারীদের দ্বারা পরিচালিত ১১৫ শয্যার অত্যাধুনিক ল্যাম্ব হাসপাতালের অবস্থান। ল্যাম্ব হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ’ও লেভেল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’ রয়েছে। ’ লিভিংস্টোন বাংলাদেশ’ স্কুল প্রতিষ্ঠাকালিন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মারিয়াম সরেন। এই পরিবারের দু’জন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজ মঙ্গলবার এ প্রতিনিধিকে জানান, বিমল রায় এক সময় ল্যাম্ব হাসপাতাল কম্পাউন্ডে স্থাপিত ‘ও লেভেল’ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ল্যাম্ব হাসপাতালে বিদেশিদের আসাযাওয়া, পদচারণা সবসময় ছিল।তাছড়া. বিভিন্ন দাতা সংস্থার লোকজনও আসা যাওয়া করতেন। বিমল রায়ের সাথে কয়েকটি বিদেশী দাতা সংস্থার লোকজনের গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে চাতুরতার সাথে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেইসব বিদেশি ডোনারদের সাথে যোগাযোগ করে স্কুল প্রতিষ্ঠায় অর্থ সাহায্যে উদ্বুদ্ধ করেন।
সে সময় স্কুল প্রতিষ্ঠায় মারিয়াম সরেনের পরিবার সার্বিক সহযোগিতা করেন। যেহেতু এটা বিদেশি অর্থে ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু কোনও ব্যক্তি তা বিক্রি করে দিতে পারে না। এটা অনৈতিক বলে ল্যাম্ব হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান।
অন্যদিকে,বিদেশি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি পরিচালনায় কি ধরনের সমস্যা হচ্ছে সেটি ডোনারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাতে হবে। সকলের মতাত নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে । প্রতিষ্ঠানটি কোনভাবে চালু রাখা সম্ভব না হলে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে অবহিত করতে হবে। এধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় দেশ,সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়ও জড়িত। সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটি অন্যকোন সেবামূলক কাজে ব্যবহার করতে পারে সবার মতামত নিয়ে। উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন এ কথাগুলো।
স্কুলটি যে ইউনিয়নে অবস্থিত সেই মন্মথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজগর আলী জানান,বিদেশী অর্থে লিভিং স্টোন স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত, কারো ব্যক্তিগত অর্থে নয়। বিমল রায় কথিত সভাপতি সেজে তা বিক্রি করে দিতে পারেন না। বিক্রি ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনকে লিখিত ও মৌখিক দু’ভাবেই জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।ভুমিক্রেতা / বায়নামাকারী কামরুল হুদা বাদশার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই তিনি সংযোগ কেটে দেন ।
পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোছাঃ শাহানাজ মিথুন মুন্নী এ প্রতিনিধিকে জানান, তিনি বিষয়টি শুনেছেন। লিভিংস্টোন স্কুলের জমি, স্থাপনা ও অবকাঠামো বিক্রি বন্ধে সহকারী কমিশনারকে (ভুমি) ক্রেতা বিক্রেতা উভয়কে নোটিশ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। এব্যাপারে বিদ্যালয়টির কথিত সভাপতি বিমল রায়ের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে বলেন আমি ঢাকায় আছি, পার্বতীপুরে এসে কথা বলবো। এব্যাপারে জানতে চাইলে সহকারি কমিশনার ( ভুমি) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনও কথা বলা সম্ভব না।
নগরকন্ঠ.কম/এআর